বিশ্বব্যাপী নানা সংকট মোকাবেলায় সব রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, সবার জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে অভিন্ন সঙ্কট মোকাবেলায় আমাদের সম্মিলিতভাবে চেষ্টা চালাতে হবে। বিভাজন, সঙ্কীর্ণতা ও বিচ্ছিন্নতার বিপরীতে একতা, সহমর্মিতা ও বহুপাক্ষিকতা বেছে নিতে হবে।
শুক্রবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সদর দফতরের জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৭৮তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, শান্তি ও টেকসই সমৃদ্ধি অর্জনের উদ্দেশ্যে আমাদের অবশ্যই সুবিচার, ন্যায় ও ন্যায্যতার নীতি অনুসরণ করে চলতে হবে, যার ভিত্তি হবে জাতিসংঘ সনদ এবং ২০৩০ এজেন্ডা।
বক্তব্যের শুরুতেই বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা ও জটিলতার প্রেক্ষাপটে এ বছর সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কের প্রতিপাদ্য ‘আস্থার পুনর্নির্মাণ এবং বিশ্বব্যাপী সংহতির পুনরুজ্জীবন: আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা আরও জোরদার করে ২০৩০ উন্নয়ন কর্মসূচি এবং এর আওতাধীন টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যসমূহ অর্জনের মাধ্যমে সবার জন্য শান্তি, সমৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ’- অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়েছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে আস্থাহীনতার কারণে সৃষ্ট সংকট এবং তা থেকে উত্তরণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ব্যাপারে মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। এর ফলে একটা শান্তিপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে অর্জিত সাফল্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। আমাদের মধ্যে মানবিক ঐক্যবোধ-ভ্রাতৃত্ববোধের পুনর্জাগরণই কেবল এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে । কারণ বর্তমান দুর্যোগ কাটাতে হলে অবিলম্বে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা দরকার।
আগামী বছর “সামিট অফ দ্য ফিউচার” আহ্বান করার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আশা করছি, এই প্রক্রিয়াটি ২০৩০ উন্নয়ন কর্মসূচি অর্জনের জন্য আমাদের প্রচেষ্টার পরিপূরক হিসেবে ভূমিকা পালন করবে।
প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের টেকসই উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে বলেন, ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেখানো পথে বাস্তবমুখী নীতিগ্রহণ, সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হতে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে পেরেছি। দারিদ্র্যের হার ২০০৬ সালের ৪১.৫ থেকে ২০২২ সালে ১৮.৭ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্যের হার ২৫.১ শতাংশ থেকে ৫.৬ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। সহাস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) অর্জনে অবিচলিত অগ্রগতি লাভের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনের ০.৪৭%-এরও কম অবদান রাখলেও বাংলাদেশ জলবায়ুজনিত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। জলবায়ুর এই বিরূপ প্রভাব আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য মারাত্মক হুমকি। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে জরুরি, সাহসী এবং উচ্চাভিলাষী সম্মিলিত পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদ দমন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ ও তৎসংশ্লিষ্ট হুমকি নিয়ে আমরা চিন্তিত। আমরা কখনোই সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম সংঘটনে বা অন্যের ক্ষতি সাধনে আমাদের ভূমি ব্যবহৃত হতে দিই না।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন দেশে পবিত্র কুরআন শরিফ পোড়ানোর মতো জঘন্য অপরাধ আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। জঘন্য এসব অপরাধ শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিকেই আঘাত করে না, এটি অস্থিরতাকে উসকে দেয় এবং বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের মানুষের মধ্যে বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে নষ্ট করে, ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। এছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান ও নীতি তুলে ধরেন।