ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে মারা যাওয়া সুজন হাওলাদারের স্ত্রী মুন্নী বেগমের আহাজারি। সম্প্রতি মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার মজুমদারকান্দি এলাকায়
অবৈধ অভিবাসনের পথে লিবিয়ার উপকূলে ফের মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে নৌকাডুবিতে ২৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এদের মধ্যে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কুদ্দুস ব্যাপারী ও তাঁর ভগ্নিপতি সুজন হাওলাদার রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। দালালদের তথাকথিত ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ চুক্তির আওতায় ইতালি পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন তাঁরা, কিন্তু সেই স্বপ্ন ডুবে গেছে গভীর সমুদ্রে।
মালয়েশিয়া ফেরত কুদ্দুস ব্যাপারী দালাল মনির শেখের প্রলোভনে পড়ে ১৬ লাখ টাকার বিনিময়ে ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ চুক্তিতে ইতালির উদ্দেশে যাত্রা করেন। শর্ত ছিল, যত দিন লাগুক, তাঁকে জীবিত ইতালি পৌঁছাতে হবে। এ চুক্তির আওতায় থাকা-খাওয়া থেকে শুরু করে সব খরচ বহন করত দালাল চক্র। একই পথে সুজন হাওলাদারও যাত্রা করেন।
কুদ্দুসের পরিবার জানায়, দালাল মনিরের স্ত্রী হামিদা বেগমের নামে ৪০ লাখ টাকার জমি লিখে দিয়ে তিনি এই চুক্তিতে অংশ নেন। কিন্তু ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির পর থেকে তাঁর আর কোনো খোঁজ নেই। সুজনের স্ত্রী মুন্নী বেগম নিশ্চিত করেছেন, তাঁর স্বামী মারা গেছেন। তিনি বলেন, ‘দালালের প্রতিশ্রুতি ছিল, যেভাবেই হোক তাঁকে ইতালি পৌঁছে দেবে। কিন্তু তারা মাঝসমুদ্রে ছেড়ে দিয়ে জীবন কেড়ে নিল। আমি এর বিচার চাই।’
রাজৈরের দরজি থেকে দালাল হয়ে ওঠা মনির শেখ এই মানব পাচার চক্রের অন্যতম হোতা। তাঁর তিন জামাতা লিবিয়ার ভয়ংকর মাফিয়া চক্রের সঙ্গে জড়িত। এলাকাবাসীর তথ্যমতে, মনিরের মাধ্যমে শত শত মানুষ ইতালি যেতে গিয়ে নিখোঁজ বা নিহত হয়েছেন। সম্প্রতি ২৩ জনের লাশ উদ্ধারের পর থেকে মনির ও তার পরিবার আত্মগোপনে চলে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, মনির ছাড়াও স্বপন মাতুব্বর, রফিকুল ইসলাম, আম্বিয়া বেগমসহ একাধিক দালাল এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। লিবিয়ার মাফিয়া চক্রের বড় নেতা হিসেবে পরিচিত মিরাজ হাওলাদার এ চক্র পরিচালনা করে আসছেন।
মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ভাস্কর সাহা বলেন, ‘মানব পাচারের ঘটনায় থানায় মামলা নেওয়া হচ্ছে, তবে এখন পর্যন্ত কেউ অভিযোগ করেননি। নিহত ও নিখোঁজদের পরিবার চাইলে পুলিশ সব ধরনের আইনি সহায়তা দেবে।’
পুলিশ জানিয়েছে, ইতিমধ্যে কয়েকজন দালালের নাম চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাঁদের ধরতে অভিযান চালানো হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের পরিবারে এখন শুধুই কান্নার রোল। কুদ্দুসের ভাই সোবাহান ব্যাপারী বলেন, ‘আমার ভাই মালয়েশিয়ায় মোটামুটি ভালোই ছিল। দেশে ফিরে দালালের খপ্পরে পড়ে জীবনের সবকিছু হারিয়েছে। দুই সপ্তাহ ধরে ওর কোনো খবর নেই।’
এই ট্র্যাজেডি কেবল একটি ঘটনা নয়, বরং প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকা এক ভয়ংকর বাস্তবতা। বডি কন্ট্রাক্টের নামে জীবন নিয়ে ভয়ংকর এই খেলা বন্ধ করা জরুরি। দালালদের আইনের আওতায় এনে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে সর্বমহল থেকে।