শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক কারসাজির ইতিহাসে জিকিউ বলপেন যেন এক জীবন্ত উদাহরণ। টানা লোকসানের মধ্যেও এই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়ে আকাশছোঁয়া পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা বাজারে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
মাত্র এক সপ্তাহে কোম্পানিটির শেয়ারমূল্য প্রায় ১৮ শতাংশ বেড়ে সর্বশেষ ৫৭২ টাকা ৪০ পয়সা ছুঁয়েছে। এর ফলে সাপ্তাহিক দর বৃদ্ধির তালিকায় জিকিউ বলপেন শীর্ষে উঠে এসেছে। অথচ কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে এই অস্বাভাবিক উত্থানের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।
নিরীক্ষিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, জিকিউ বলপেন টানা তিন বছর ধরে লোকসানে রয়েছে—
২০২৪ সালে শেয়ারপ্রতি লোকসান ৩ টাকা ৫০ পয়সা
২০২৩ সালে ১২ পয়সা
২০২২ সালে ২ টাকা ৬৫ পয়সা
তবুও কোম্পানিটি গত তিন বছর ২.৫০% থেকে ৩% পর্যন্ত ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে, যা বাজার বিশ্লেষকদের কাছে ‘অবাস্তব’ বলে মনে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাত্র ৮ কোটি ৯৩ লাখ টাকার পরিশোধিত মূলধন থাকায় কারসাজিকারীরা সহজেই এই শেয়ার নিয়ে খেলছে এবং দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে তুলছে। কোম্পানির পিই রেশিও নেতিবাচক এবং আর্থিক ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও, শেয়ারটির অস্বাভাবিক উত্থান বাজারের শৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, একই খাতের মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) ২০২৪ সালে ২৫% ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে এবং ২০২৫ অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে তাদের ইপিএস ১৪ টাকা ২৮ পয়সা। তবুও বিএসসির শেয়ার লেনদেন হচ্ছে ১২০ টাকার নিচে। বিপরীতে জিকিউ বলপেনের শেয়ার কয়েক মাসের মধ্যে ১৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৫৭২ টাকায় পৌঁছে গেছে।
বিনিয়োগকারীরা বলছেন, বিএসইসি ও ডিএসই’র চোখের সামনেই এই কৃত্রিম চাহিদা তৈরি ও দর বাড়ানোর কারসাজি চলছে। তবুও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। সাধারণত বড় ক্ষতি হওয়ার পরই লোক দেখানো তদন্ত শুরু হয়—যা বাজারে আস্থা ফেরাতে যথেষ্ট নয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কারসাজিকারীদের বিপুল অবৈধ মুনাফার তুলনায় যে সামান্য জরিমানা করা হয়, তা আসলে তাদের জন্য এক ধরনের সবুজ সংকেত। বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে শুধু জরিমানা নয়, কঠোর শাস্তি ও বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। না হলে পুঁজিবাজার রয়ে যাবে কিছু প্রভাবশালী কারসাজিকারীর খেলার মাঠে, আর ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই।