logo

ঘোষণার পর ঘোষণা, বাস্তবায়নে শূন্য—ফাইলের কবরস্থানে শেয়ারবাজার সংস্কার

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

Published:10 Feb 2026, 04:07 AM

ঘোষণার পর ঘোষণা, বাস্তবায়নে শূন্য—ফাইলের কবরস্থানে শেয়ারবাজার সংস্কার


প্রায় দুই দশক ধরে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা মাসুদুর রহমানের মতো হাজারো বিনিয়োগকারী আবারও প্রতারিত বোধ করছেন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার ঘোষণা শুনে অনেকেই ভেবেছিলেন—এবার অন্তত কথার সঙ্গে কাজ মিলবে।

কিন্তু ৯ মাস পার হয়ে গেলেও বাস্তবে শেয়ারবাজারে যোগ হয়নি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানও**। হতাশ বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন এখন একটাই ঘোষণাগুলো কি শুধুই ফাইলের শোভাবর্ধক?**


ক্ষোভ ঝরিয়ে মাসুদুর রহমান বলেন,


 “ভাবছিলাম অন্তর্বর্তী সরকার আমলাতন্ত্রকে বাধ্য করবে। কিন্তু এখানে তো ফাইলই সরকারের চেয়ে শক্তিশালী!”


পাঁচ নির্দেশনা, নয় মাস—অগ্রগতি শূন্য


গত বছরের ১১ মে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস শেয়ারবাজার সচল করতে যে পাঁচ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তার একটিও আজ পর্যন্ত পূর্ণ বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।


রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্তি থেকে শুরু করে দেশীয় ভালো কোম্পানিকে প্রণোদনা, বিদেশি বিশেষজ্ঞ যুক্ত করা কিংবা বড় ঋণগ্রহীতাদের শেয়ার ও বন্ডের পথে আনতে—সবকিছুই এখন কাগজে সীমাবদ্ধ।


২০১২–এর পর তালা, বাজারে ঢুকছে শুধু জাঙ্ক


ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য বলছে, ২০১২ সালে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস পিএলসি–ই ছিল সর্বশেষ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, যা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়।


এরপর এক দশকের বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের দরজা বন্ধ, অথচ বাজারে ঢুকেছে একের পর এক দুর্বল ও বিতর্কিত কোম্পানি।

ফলাফল—অস্থির বাজার, বিনিয়োগকারীর আস্থা ধ্বংস, আর লুটেরা চক্রের স্বর্গরাজ্য।


নির্দেশ আসে, কিন্তু মন্ত্রণালয়েই মৃত্যু


প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনার পর অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রস্তুতির নির্দেশ দিলেও, সেখানেই সংস্কারের শ্বাসরোধ হয়ে যায়।

আগের সরকারগুলোর মতো এবারও প্রমাণ হলো—নীতিনির্ধারকের চেয়ে আমলাতন্ত্রই শেষ সিদ্ধান্তদাতা।


বিএসইসি বলছে—আমরা নিরুপায়


বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র আবুল কালাম খোলাখুলি স্বীকার করেন,


“রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক কোম্পানির তালিকা করা হয়েছে। এফআইডি নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নের জায়গায় গিয়েই সব থেমে যায়।”


অর্থাৎ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা কাজ করলেও ফাইল আটকে থাকছে অন্য টেবিলে।


প্রণোদনার গল্প নেই, বাজারে আসার আগ্রহও নেই


ভালো পারফরম্যান্স করা দেশীয় কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনতে যে কর ও নীতিগত প্রণোদনার কথা বলা হয়েছিল,

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এখনো নীরব দর্শক।


আইপিও বিধিমালা সংশোধন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তব সুবিধা না থাকায় বড় কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে আগ্রহী নয়।


বিদেশি বিশেষজ্ঞ যুক্ত করার নির্দেশনাও শেষ পর্যন্ত নামমাত্র সমাধানে পরিণত হয়েছে।


বড় ঋণ, বন্ড বাজার—সবই ‘ফাইল-প্রকল্প’


বড় ঋণগ্রহীতাদের শেয়ার ও বন্ড ছাড়ার মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহে উৎসাহ দেওয়ার ক্ষেত্রেও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

বিএসইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশিকা দিলেও, বাস্তবে বন্ড বাজার এখনো নিষ্ক্রিয় ও অবহেলিত।


বাজার বলছে—এটাই ব্যর্থতার স্বাক্ষর


ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি সাইফুল ইসলাম সরাসরি বলেন,


 “নয় মাসে একটি বড় সিদ্ধান্তও বাস্তবায়িত না হওয়া মানে স্পষ্ট ব্যর্থতা। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্তিতে সরকার ব্যর্থ।”


তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়টাই ছিল সংস্কারের স্বর্ণ সুযোগ।

এই সময়ে অন্তত চার-পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হলে বাজারে সাহসী বার্তা যেত।


বিএসইসি, এফআইডি ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী–এর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ কমিটি প্রতিবেদন দিলেও, মন্ত্রণালয়গুলোর অনীহায় তা আজ ধুলো জমা কাগজ।


শেষ কথা—সংস্কার নয়, চলছে সময়ক্ষেপণ


সব মিলিয়ে, শেয়ারবাজার সংস্কার এখন আর থমকে নেই—

এটি ইচ্ছাকৃতভাবে ধীর করে রাখা হয়েছে বলেই প্রশ্ন উঠছে।

নির্দেশনা আছে, কমিটি আছে, প্রতিবেদন আছে—

কিন্তু সাহসী সিদ্ধান্ত নেই।