
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
Published:10 May 2026, 06:21 AM
শেয়ারবাজারের অর্ধেকের বেশি মিউচুয়াল ফান্ড ঝুঁকিতে — বিনিয়োগকারীদের জন্য বার্তা
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডগুলো নিয়ে বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
যেসব ফান্ডের বাজারদর তাদের প্রকৃত সম্পদমূল্য বা এনএভি (NAV)-এর তুলনায় অনেক কম, সেসব ফান্ডকে হয় অবসায়ন (বন্ধ) করা হবে, নয়তো বে-মেয়াদি (Open-end) ফান্ডে রূপান্তর করা হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই সিদ্ধান্ত নেবেন ফান্ডের ইউনিটধারীরাই।
সহজ ভাষায় এনএভি (NAV) কী?
এনএভি বা Net Asset Value হলো একটি ফান্ডের প্রকৃত সম্পদের মূল্য।
সহজ উদাহরণ:
ধরা যাক, একটি মিউচুয়াল ফান্ডের সব সম্পদ মিলিয়ে প্রতি ইউনিটের প্রকৃত মূল্য ১০ টাকা।
অর্থাৎ ফান্ডটির এনএভি = ১০ টাকা।
কিন্তু বাজারে সেই ইউনিট যদি ৭ টাকায় কেনাবেচা হয়, তাহলে বোঝা যাবে বাজারদর এনএভির চেয়ে ৩০% কম।
এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা প্রকৃত মূল্যের তুলনায় কম দামে ইউনিট বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
কোন ফান্ডগুলোর ওপর নতুন নিয়ম কার্যকর হবে?
বিএসইসির সংশোধিত মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা অনুযায়ী—
১২ মে পর্যন্ত যেসব মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের বাজারমূল্য তাদের এনএভির তুলনায় কমপক্ষে ২৫% কম থাকবে, সেসব ফান্ডকে ১২ জুনের মধ্যে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে।
সেই পদক্ষেপ হতে পারে দুই ধরনের—
ফান্ড অবসায়ন (Liquidation)
অথবা
বে-মেয়াদি ফান্ডে রূপান্তর (Conversion to Open-end Fund)
কীভাবে নির্ধারণ হবে কোন ফান্ড এই নিয়মের আওতায় পড়বে?
এটি একদিনের বাজারদরের ভিত্তিতে নয়।
বরং ১২ মে’র আগের ৬ মাসের গড় বাজারমূল্য হিসাব করা হবে।
উদাহরণ:
একটি ফান্ডের এনএভি = ১০ টাকা
গত ৬ মাসে গড় বাজারদর = ৭ টাকা
তাহলে বাজারদর এনএভির তুলনায় ৩০% কম।
অর্থাৎ এই ফান্ড নতুন নিয়মের আওতায় পড়বে।
এই গড় মূল্য নির্ধারণ করবে ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান বা ট্রাস্টি বোর্ড।
এরপর কী হবে?
বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী—
১. ট্রাস্টি বোর্ড রেকর্ড ডেট ঘোষণা করবে
আগামী ১২ জুনের মধ্যে ট্রাস্টি সভা করে রেকর্ড ডেট ঘোষণা করতে হবে।
### ২. লেনদেন বন্ধ হবে
রেকর্ড ডেটের পর থেকে ওই ফান্ডের ইউনিটের শেয়ারবাজারে লেনদেন বন্ধ হয়ে যাবে।
### ৩. ইউনিটধারীদের বিশেষ সভা হবে
এরপর ইউনিটধারীদের বিশেষ সভায় ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—
ফান্ড বন্ধ হবে,
নাকি
বে-মেয়াদি ফান্ডে রূপান্তর হবে।
সংখ্যাগরিষ্ঠ ইউনিটধারীর মতামতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হবে।
বর্তমানে কতগুলো ফান্ড ঝুঁকিতে?
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)-এ বর্তমানে ৩৬টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড তালিকাভুক্ত রয়েছে।
এর মধ্যে—
২টি ফান্ড ইতোমধ্যে বে-মেয়াদিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় আছে
বাকি ৩৪টির মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ফান্ড এনএভির তুলনায় ২৫% বা তার বেশি ডিসকাউন্টে লেনদেন হচ্ছে
অর্থাৎ জুনের মধ্যেই এসব ফান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হতে পারে।
বিএসইসি কেন এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে?
বিএসইসির মতে, বর্তমানে অনেক মিউচুয়াল ফান্ড প্রকৃত মূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে লেনদেন হচ্ছে।
ফলে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
উদাহরণ:
কোনো ইউনিটের প্রকৃত মূল্য যদি ১০ টাকা হয়, কিন্তু বাজারে বিক্রি করতে হয় ৬.৫ বা ৭ টাকায়—তাহলে বিনিয়োগকারী লোকসানে পড়ছেন।
এই পরিস্থিতি থেকে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতেই নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বে-মেয়াদি ফান্ডে রূপান্তর হলে লাভ কী?
এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বর্তমানে মেয়াদি ফান্ডের ইউনিট শেয়ারবাজারে বাজারদরে কেনাবেচা হয়।
তাই অনেক সময় ইউনিটের দাম এনএভির তুলনায় অনেক কমে যায়।
কিন্তু বে-মেয়াদি ফান্ডে রূপান্তরের পর—
বিনিয়োগকারীরা এনএভির কাছাকাছি দামে ইউনিট বিক্রি করতে পারবেন
বাজারে ডিসকাউন্টে বিক্রি করতে হবে না
ইউনিট বিক্রির আবেদন করলে ৩ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে
অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা প্রকৃত মূল্যের কাছাকাছি অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
ফান্ড অবসায়ন হলে কী হবে?
যদি ইউনিটধারীরা ফান্ড বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে—
ফান্ডের সম্পদ বিক্রি করা হবে
দায় পরিশোধের পর অবশিষ্ট অর্থ ইউনিটধারীদের মধ্যে বিতরণ করা হবে
এক্ষেত্রেও সাধারণত বাজারদরের চেয়ে বেশি অর্থ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে?
বিএসইসি-সংশ্লিষ্টদের মতে, অধিকাংশ ফান্ড যদি বে-মেয়াদিতে রূপান্তরিত হয়, তাহলে বাজারে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
কারণ:
ফান্ডকে সঙ্গে সঙ্গে শেয়ার বিক্রি করতে হবে না
বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে ইউনিট নগদায়ন করতে পারবেন
ফলে বাজারে বড় ধরনের বিক্রির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম।
ইউনিটধারীরা আরও কী সুবিধা পাবেন?
বিশেষ সভায় ইউনিটধারীরা চাইলে—
সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতে পারবেন
ফান্ড পরিচালনায় নতুন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন
অর্থাৎ ইউনিটধারীদের মতামতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মেয়াদি ও বে-মেয়াদি ফান্ডের পার্থক্য কী?
মেয়াদি (Closed-end) ফান্ড
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত
বাজারদরে কেনাবেচা হয়
মেয়াদ শেষে অবসায়নের কথা
বে-মেয়াদি (Open-end) ফান্ড
শেয়ারবাজারের বাইরে কেনাবেচা হয়
সাধারণত এনএভির কাছাকাছি দামে ইউনিট বিক্রি হয়
বিনিয়োগকারী চাইলে ইউনিট জমা দিয়ে অর্থ তুলে নিতে পারেন
বিনিয়োগকারীদের জন্য মূল বার্তা
বর্তমানে যেসব মিউচুয়াল ফান্ড এনএভির তুলনায় অনেক কম দামে লেনদেন হচ্ছে, সেগুলোর ইউনিটধারীদের জন্য এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হতে পারে।
কারণ—
বাজারদরের চেয়ে বেশি মূল্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে
এনএভির কাছাকাছি দামে ইউনিট বিক্রির পথ খুলবে
ইউনিটধারীদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হবে
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউনিটধারীদের মতামত যেন কোনোভাবে প্রভাবিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।