
আপন ঘর ডেস্ক
Published:01 Jul 2025, 05:12 AM
শেয়ারবাজার লুটের মহাকাব্য: ২০ হাজার কোটি টাকার নয়ছয়ে লোটাস-কামাল সিন্ডিকেট
২০০৯-১০ সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনা এখনো তাজা স্মৃতিতে। হাজারো সাধারণ বিনিয়োগকারীর চোখের জলে ভেসে গিয়েছিল সেই সময়ের শেয়ারবাজার। চিৎকার, কান্না আর বিক্ষোভে প্রকম্পিত হয়েছিল ঢাকার মতিঝিল। ঘটনার পর গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। প্রয়াত ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে গঠিত সেই কমিটি কেলেঙ্কারির মূল হোতাদের চিহ্নিত করে। প্রতিবেদন জমা দিলেও, তাতে যাদের নাম ছিল—সালমান এফ রহমান ও লোটাস কামাল—তারা নানান কৌশলে সেই রিপোর্ট স্থগিত রাখতে সক্ষম হন। রিপোর্টটি আর প্রকাশ পায়নি।
এই কেলেঙ্কারির অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত লোটাস কামাল, যিনি ২০১৮-২০২৩ মেয়াদে ছিলেন দেশের অর্থমন্ত্রী। তদন্ত সূত্র বলছে, অসুস্থ থাকাকালেও শেয়ারবাজার কারসাজিতে যুক্ত ছিলেন তিনি। অভিযোগ, শেয়ারের মাধ্যমে লোটাস কামাল হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। অথচ তার নিজের কোনো লাভজনক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই; আয়কর বিবরণীতে সবই লোকসান গুনা কোম্পানি। প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে তিনি গড়লেন এত বিপুল সম্পদের পাহাড়?
উত্তর খুঁজতে গিয়ে উঠে আসে ভয়ঙ্কর চিত্র। শেয়ারবাজার ছিল তার মূল ‘মুনাফার খনি’। একাধিক সূত্রের দাবি, আজও বাজার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে তার সিন্ডিকেটের প্রভাব। নেপথ্যে থেকে গড়ে তুলেছেন একচ্ছত্র ক্ষমতার বলয়, যারা বাজারে দরবৃদ্ধি ও দরপতনের নিয়ন্ত্রক।
শুধু লোটাস নয়, ২০০৯-১০ সালের আরেক আলোচিত নাম ছিল তৎকালীন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা মোস্তফা কামাল। তার মালিকানাধীন লোকসানি প্রতিষ্ঠান সিএসএম কামাল টেক্সটাইলের শেয়ারের দর ওই সময়ে বেড়ে গিয়েছিল ১৬ গুণ। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, কোম্পানির প্রকৃত অবস্থা বিবেচনা না করে তিনি স্টক ডিভিডেন্ড, রাইট শেয়ার, সম্পদ পুনর্মূল্যায়নের ঘোষণা দিয়ে শেয়ারদর কৃত্রিমভাবে বাড়ান এবং সেই ডিভিডেন্ড শেয়ার বিক্রি করে প্রায় ২১ কোটি টাকা লাভ করেন। অথচ কোম্পানিটিতে তার বিনিয়োগ ছিল মাত্র ৭ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে জবাব দিতে গিয়ে তিনি দাবি করেন, মূল শেয়ার নয়, কেবল স্টক ডিভিডেন্ডই বিক্রি করেছিলেন। তবে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন উঠতেই তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অনুষ্ঠান সমাপ্ত করেন।
এরপর তিনি কোম্পানিটি বিক্রি করে দেন আলিফ গ্রুপকে। নিজের নাম ব্যবহার না করলেও তার মেয়ে নাফিসা কামালের মাধ্যমে শেয়ার কারসাজি চালিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি দুবাইয়ে পাচার করা অর্থে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা পরিচালনার তথ্যও উঠে এসেছে।
২০১০ সালের ধস ও তদন্ত রিপোর্টেও সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলেন লোটাস কামাল। তিনি তখন সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি। বিভিন্ন প্রতিবেদন ও অভিযোগে বলা হয়, তার নির্দেশনা, ছত্রচ্ছায়া ও পছন্দের লোক নিয়োগের মাধ্যমে বিএসইসি এবং স্টক এক্সচেঞ্জের কাঠামো দখলে নেন। এভাবেই গড়ে তোলেন একটি অপ্রতিরোধ্য সিন্ডিকেট। যার বিরুদ্ধে তদন্তে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়নি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে শেয়ারবাজার কখনোই স্থিতিশীল বা বিনিয়োগবান্ধব হবে না। ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে তাদের প্রভাবেই সাধারণ বিনিয়োগকারীরা একের পর এক সর্বস্বান্ত হয়েছেন, লোপাট হয়েছে তাদের কষ্টার্জিত পুঁজি।
শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির দায়ে জবাবদিহি কবে? না হলে, শেয়ারবাজারের ভবিষ্যৎ কি শুধুই ধ্বংসের পথে?