শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ক্লোজড-এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ড অবসায়ন ও ওপেন-এন্ডে রূপান্তর নিয়ে নতুন করে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ তুলে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান রেইস ম্যানেজমেন্ট পিএলসি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের বিরুদ্ধে চলমান আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তালিকাভুক্ত ফান্ডগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর করা উচিত নয়।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ক্লোজড-এন্ড ফান্ডের অবসায়ন বা রূপান্তর প্রক্রিয়া স্থগিত করতে রেইস এখন পর্যন্ত আদালত থেকে সরাসরি কোনো নির্দেশনা পায়নি। মূলত বিএসইসির বিভিন্ন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে করা একাধিক রিট ও আবেদন বিচারাধীন থাকাকেই আদালত অবমাননার প্রসঙ্গে তুলে ধরেছে প্রতিষ্ঠানটি।
রেইসের পক্ষে ব্যারিস্টার মো. মুস্তাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত আইনি নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, বিএসইসির সাম্প্রতিক পদক্ষেপ চলমান বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং তা আইনি প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।
গত বছরের নভেম্বরে কার্যকর হওয়া সংশোধিত মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিধিমালায় বলা হয়, যেসব ক্লোজড-এন্ড ফান্ড ইউনিট নেট অ্যাসেট ভ্যালুর (এনএভি) তুলনায় ২৫ শতাংশের বেশি ডিসকাউন্টে লেনদেন হবে, সেগুলো বিনিয়োগকারীদের ভোটের ভিত্তিতে অবসায়ন অথবা ওপেন-এন্ড ফান্ডে রূপান্তরের আওতায় আসবে।
বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ১৩৪ কোটি টাকার সম্পদ পরিচালনা করছে রেইস, যা দেশের তালিকাভুক্ত মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাতের প্রায় ৪৭ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। প্রতিষ্ঠানটির অধীনে থাকা ১০টি বড় ফান্ড গত পাঁচ বছরে সম্মিলিতভাবে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মধ্যে রয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি রেইসের দুর্বল ব্যবস্থাপনা পারফরম্যান্সেরই প্রতিফলন।
বিএসইসির তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীরা ধারাবাহিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়লেও ব্যবস্থাপনা ফি বাবদ রেইস প্রায় ৬০০ কোটি টাকা আয় করেছে। দুর্বল রিটার্নের কারণে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় রেইস পরিচালিত ইউনিটগুলো সেকেন্ডারি মার্কেটে বড় ধরনের ডিসকাউন্টে লেনদেন হচ্ছে।
গত ৭ মে বিএসইসি রেইস পরিচালিত কয়েকটি ক্লোজড-এন্ড ফান্ড অবসায়ন বা রূপান্তরের নির্দেশনা দেয়। এরপরই ‘ল’ ভ্যালি’ নামের একটি আইন প্রতিষ্ঠান রেইসের পক্ষে কমিশনকে আইনি নোটিশ পাঠিয়ে ওই সিদ্ধান্ত স্থগিতের দাবি জানায়। একই সঙ্গে নোটিশে সতর্ক করা হয়, অন্যথায় কমিশনকে “গুরুতর বিচারিক প্রতিক্রিয়ার” মুখোমুখি হতে হতে পারে।
রেইস নিজেদেরকে “নিয়ন্ত্রক হয়রানির শিকার” বলেও দাবি করেছে। এর আগে ইউনিটহোল্ডারদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিএসইসি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালিত ফান্ডগুলোর বেনিফিশিয়ারি ওনার (বিও) হিসাব স্থগিত করে এবং ট্রাস্টি ও কাস্টডিয়ানদের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের নির্দেশ দেয়।
অভিযোগ রয়েছে, মিউচ্যুয়াল ফান্ড রুলস-২০০১ অনুযায়ী অনুমোদিত কাস্টডিয়ানের মাধ্যমে সম্পদ সংরক্ষণ না করে রেইস বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউসে পৃথক বিও হিসাব খুলে সম্পদ পরিচালনা করেছে। বিএসইসির মতে, এতে ইউনিটহোল্ডারদের সম্পদ স্বাভাবিক তদারকির বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।
এছাড়া রেইস পরিচালিত ফান্ডগুলোর বিরুদ্ধে অনিয়মিত ব্লক ট্রেড, আন্তঃফান্ড লেনদেন এবং সম্পদের অপব্যবহারের অভিযোগও তদন্ত করেছে কমিশন। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ১২টির মধ্যে ১১টি ফান্ডে জরিমানা আরোপ করা হয়। যদিও রেইস এসব অভিযোগ এবং জরিমানার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।
রেইসের দাবি, কমিশনের আরোপিত বিধিনিষেধের কারণেই তারা স্বাভাবিকভাবে ফান্ড পরিচালনা করতে পারেনি। বিশেষ করে বিও হিসাব স্থগিত থাকায় বন্ড ক্রয় ও পোর্টফোলিও পুনর্বিন্যাস কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পরবর্তীতে যেসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, তার দায় প্রতিষ্ঠানটির নয় বলেই দাবি তাদের।
একই সঙ্গে আইনি নোটিশে রেইস জানিয়েছে, হাইকোর্টের কিছু আদেশের ফলে তাদের জব্দ করা ব্যাংক হিসাব পুনরায় সচল হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের বিভিন্ন স্থগিতাদেশের মাধ্যমে তারা ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
বাজার সংস্কার বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল পারফরম্যান্সের অ্যাসেট ম্যানেজারদের বিরুদ্ধে সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ায় দেশের মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাত দীর্ঘদিন ধরে সংকটে রয়েছে। আর এই দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ বিনিয়োগকারীরা, যাদের বিপুল অর্থ গভীর ডিসকাউন্টে আটকে আছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের সূচনা ২০১৮ সালে, যখন মেয়াদোত্তীর্ণ হতে যাওয়া কয়েকটি ক্লোজড-এন্ড ফান্ডের মেয়াদ আরও ১০ বছর বাড়ানো হয়। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা পূর্ণ এনএভি পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন এবং বাজারে আস্থার সংকট আরও গভীর হয়।
এর পর থেকেই রেইস পরিচালিত বেশ কয়েকটি ফান্ড ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ডিসকাউন্টে লেনদেন শুরু করে। এতে আগে ইউনিট বিক্রি করতে বাধ্য হওয়া ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।